দাসত্ব মানষিকতা


গরীবের দায়ভারটা শুধুই পেটের, তাই পেটের জন্য শয্যা পাততে যেমন তাদের দ্বীধা নেই, রাত-দিন মল ছাটতেও তাঁদের ঘৃণা নেই। শত্রুর একটুখানী স্বার্থণ্বেষী সহানুভূতিও তাদের আবেগ কেড়ে নেয়।
বাঙ্গালি জাতি আজীবন গরীব, গরীব জীবন-যাপনে, গরীব কার্য্যকরনে; মণণে। নিজের বলা এই কথাগুলোয় আমি নিজেই লজ্জায় ডুবে মরি, তবু সত্যটাকে অস্বীকার করতে পারি না বলে, অকপটে তা বলতে পিছ‘পা হই না।

প্রাচীণ বাংলার ইতিহাস বড় করুণ, যে ইতিহাস করূণ হৃদয়ে বরূণ সুখ না তুলে বারংবার এমন দূর্বিসহ স্থানে নিক্ষেপ করেছে, যেখান থেকে বাঙ্গালী জাতি তখনোও বের হতে পারেনি, এখনো পারছে না। নিজেদের দাসত্ব জীবনের মানষিকতা, শোষিত থাকার চিন্তাভাবনা, কোন কালেই এরা নিজেদের চিন্তার উর্দ্ধে স্থাপন করে তা থেকে বের হতে পারেনি। তাইতো স্বাধীন বন্দরে থেকেও প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে তাদের দাসত্ব কা্র্য্যকলাপ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই জাতির দাসত্ব জীবন-যাপন ও দাসযুক্ত মনোভাব সম্পর্কে। প্রাচীণ বাংলার ইতিহাস ঘেটে-ঘুটে যতটুকু জানা যায়, প্রায় চারহাজার বছরপূর্বে এই বঙ্গে বসতি গড়ে উঠে দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠীদের মাধ্যমে। এরপর এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে।শাসিত বঙ্গের মানুষের মানষিকতায় জন্ম নেয় শোষিত হবার মানষিকতা।তাইতো এই দেশকে শোষন করার জন্য ক্রমান্বয়ে উত্থান ঘটে বিভিন্ন শাসকের (প্রাচীণ কালে), ঔপনিবেশিকদের এবং সর্বশেষ পাকিস্থানিদের।
শোষনের নির্মম যাতনা যদি বাঙ্গালীকে আহত না করত তবে বাঙ্গালী জাতি বোধহয় আজীবনের জন্য দাস হয়ে থাকার মনোভাব পোষন করত। যুগের বিবর্তন ধারায় আজ এমন এক পর্যায়ে পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে, যেস্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের আজও স্বীকার করতে হচ্ছে সে নির্মম সত্যটাকে। শাসকের নির্মম যাতনার বেড়াকলে যারা পড়ছে, একমাত্র তারাই শাসকের বিরূদ্ধে লড়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে, অথচ অল্প-বিস্তর সুবিধাভোগীরা আজীবন ছেটে গেছে শোষকের উছিষ্ট মল আর যাতনা বিস্তৃত করেছে শোষিতদের মাঝে। তাই শোষিতদের অর্জিত বিজয়টিকে তারা জয় হিসেবে মেনে নিলেও আজীবন মন থেকে তাকে ঘৃণা ছুড়েছে।
ইতিহাস ঘেটে আমরা জেনেছি একমাত্র শোষিতদের আত্মত্যাগে স্বাধীনতা নামক শব্দটির দেখা পেয়েছে এই বঙ্গজাতি। তাই স্বাধীনতা শব্দটি শোষিতদের হৃদয়ের আত্মকরূণ সুর। আমরা সকলে জানি; “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে, স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন”। তাই লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে বাঙ্গালী স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটিকে পেলেও তা ধরে রাখার ক্ষেত্রে বারংবার ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার কারণটাও সু-স্পষ্ট, যেহেতু স্বাধীনতা এসেছে নিপীড়িত লোকদের হাত ধরে আর তারা ছিল দেশের সবচেয়ে বেশী নিগৃহীতজন। তাই রক্তের বিনিময়ে শক্তভীটা পেলেও তা পরিচালনার ভার চলেগেছে তখনকার সুবিধাভোগীদের হাতে। সুবিধাভোগীরা চিরকালই স্বার্থপরায়ন আর পা‘ছাটা স্বভাবের। তাইতো অসহায় জনের রক্তের অধিকারের পূর্ণফলও যেন তাদেরই জন্য।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যে বিজয় বাঙ্গালির হাতে ধরা দিয়েছে, তাও লক্ষ শোষিত জনের হাত ধরে। অথচ দেশচালনার অজ্ঞতায় তা আজ চলে গেছে স্বার্থন্বেষী, সুবিধাভোগীদের হাতে। যাদের চিত্ত স্বাধীনতার বিরোধীতায় ভরপূর ছিল, তারা আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় জন। তাইতো আমরা আজ স্বাধীনতা অর্জনের পরও পরাধীন মানষিকতার লোকদের কাছে জিম্মি।
বাঙ্গালীর চেতনার পরিবর্তন হয়েছে, দেশ চালনার জন্য নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। অথচ দেশের দায়িত্ব ভার গ্রহণে তারা এগিয়ে যেতে পারছে না। কেন?????
শুধু একটাই কারণ, স্বাধীনতার পর যে স্বার্থণ্বেষী মহলের হাতে ক্ষমতা চলে গেছে, তাদের হাত থেকে আজ ক্ষমতা নেয়ার ক্ষমতা বাঙ্গালী হারিয়েছে! স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যে জারজদের সংখ্যা ছিল একশ আজ তা লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বাঙ্গালী কোথায় থেকে তাদের স্বাধীন ক্ষমতার অগ্রাসন শুরু করবে? রাজমহল থেকে ছিটমহল, গণভবন থেকে জনভবন, চাঁদহাট থেকে ফুটপাট সব স্থানে আজ তাদের স্ব-বিস্তার। আর এই স্ব-বিস্তারের পূর্ণাঙ্গরূপ দিয়ে চলেছে আওয়ামী আর বি.এন.পি নামক দু‘টি দল। সহজ-সরল যে প্রাণগুলো আজো নিজেদের মনপ্রাণ সঁপে রাখে যে দু‘টি দলকে সেদলগুলো নাকি আজ রাষ্ট্রদ্রৌহি কিংবা সৈরাচারীদের সহযৌগিতা ছাড়া ক্ষমতায় যেতে পারে না। এরমানে কি? খুবই সহজ অংক চলে গেছে অসহায় বাঙ্গালীর মনে। তারা বুঝে গেছে রাষ্ট্রদ্র্যৌহিদের বিস্তার আজ কোথায় পৌঁছে গেছে।
অপেক্ষায় আছি আবারো দাসত্ত্ব জীবনের। বুঝি গেছি আবারো পরাধীনতার মোহজাল বিস্তার করতে যাচ্ছে আমাদের মাথার উপর। আমার এই ভয় মিথ্যা কিংবা উপেক্ষিত নয়। আমার এই ভয় বাস্তবতা ভেবে। যখন থেকে জেনেছি, রাষ্ট্রদ্র্যৌহিরা ৪০ বছরে এইদেশে গেঁথে বসেছে, দেশের বড়-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক তারা, এদেশে তাঁদের রয়েছে বড়-বড় হাসপাতাল, যেখানে তারা সহজ-সূলভ সেবা প্রদান করে বাঙ্গালীর দূর্বল অনুভূতিকে পুঁজি করতে, এই দেশে চলে তাদের শক্তিশালী ব্যাংক সেবা কার্য্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিদ্যালয়, মসজিদ কিংবা মাদ্রাসায় তারা স্ব-বিস্তার ঘটাচ্ছে, তাদের অন্যায়-অবিচারের বিচার কার্য্যক্রম ঠেকাতে কিছু-কিছু স্বাধীনকামী বাঙ্গালী এগিয়ে আসছে, ক্ষমতার মগডালে বসে কিছু-কিছু দেশজারজ রাষ্ট্রদ্র্যৌহি নেতাকর্মীদের সহায়তা করছে দেশে উৎশৃঙ্খল কার্য্যক্রম চালাতে, তখন বাঙ্গালী জাতির বিগলিত মন দেখে অসহায় বক্তব্য ছাড়া আমাদের দেবার মতো আর কিছু থাকে না।
বাঙ্গালী দৃষ্টি প্রতিবন্দী নয়, ইতিহাস তার প্রমান দেয়। তবুও যখন দেখী দেশের এমন পরিস্থিতিতে আজও তাদের নিরব অবস্থান, তখন সহজেই ধরে নেই, তারা আজও দাস মানষিকতা থেকে বের হতে পারেনি। আজও নিজের স্বাধীন দেশে তারা কতটা পরাধীন, নিজের স্বাধীন দেশে অন্যের সামান্য সহানুভূতির সুখে তারা আজো কতটা সহজ সুখে গ্রহণ করে। অথচ নিজের অজানন্তে নিজের স্বাধীনকামী মাতাকে অন্যের কাছে কতটা সহজ করে বিকায় রাষ্টদ্র্যৌহিদের অন্যায় আবদারে।

Advertisements